সামাজিক অবক্ষয়? নাকি ভাইরালের নেশা?

সামাজিক অবক্ষয়? নাকি ভাইরালের নেশা?

আচ্ছা, আপনার মতে বইয়ের কতগুলো প্রকার আছে? যেকোনো একটি বিষয় নিয়ে কম্পিউটারের লিখে এবং প্রিন্ট করে, বাজারজাত করলেই সেটা বই হয়? আমি মনে করি “না”। বইতো এমন হওয়া উচিত, যা দ্বারা মানুষের অভিজ্ঞতা ও চিন্তাভাবনা আপডেট হবে। মানুষ নতুন বিষয়গুলো সম্পর্কে জানবে এবং তার পূর্বের ভুলগুলো সংশোধন করতে পারবে।

বইকে মানুষের সবথেকে কাছের বন্ধু বলা হয়, কারণ বই থেকে মানুষ তার ভুলগুলো শুধরে নেয় এবং সঠিক পথ বেছে নেয়। কিন্তু যদি বই এমন হয় – যে, বই আপনাকে ভুল বিষয়ের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করছে! তাহলে কেমন হবে।

এবার চলুন মূল কথায় আসি। গত ১ই ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) “অমর একুশে বইমেলা ২০২৪” শুরু হয়। সম্প্রতি বাবার থেকে বয়স্ক পুরুষকে বিয়ে করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া দম্পতি মুশতাক এবং তিশা তাদের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে “তিশা এন্ড মুশতাক” ও “তিশার ভালোবাসা” নামক দুইটি বই বাজারে আনে।

এবং একটি ইন্টারভিউতে দেখা যায় তারা ১৪ই ফেব্রুয়ারি “তিশা তোমার জন্য” এই নামে একটি বই বাজারে আনার ঘোষণা দেয়। বই প্রকাশ তাদের পার্সোনাল বিষয়। তবে আমার কথা হলো, এগুলো থেকে পাঠকরা বা বর্তমান যুবসমাজ কি শিখছে?

সম্প্রতি “Janobani। জনবাণী” নামক একটি অনলাইন পোর্টাল থেকে প্রকাশ হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আনুমানিক ১৫-২০ বছর বয়সী এক তরুণী বলছে “আমার ও ইচ্ছে করছে এমন বুড়ো লোককে বিয়ে করতে” এবং সাংবাদিকের প্রশ্নে আরো বলে তার পছন্দ ৫০-৬০ বছরের বয়স্ক পুরুষকে।

সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করে বাংলাদেশের একজন মানুষের গড় আয়ু ৬০ বছরের মতো। তবে এই বয়সে যদি আপনার স্বামী মারা যায় তাহলে কি করবেন? প্রশ্নের উত্তরে ওই তরুণী বলেন ”উনার সকল সম্পত্তি টাকা-পয়সা আমার, আমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে বিয়ে করবো”

এবং পাশ থেকে আরও অনেকে বলতেছিলো তারাও তিশা ও মুশতাকের মত হতে চায়। এবং তাদের দ্বারা নাকি বুঝা যাচ্ছে ভালোবাসার সুন্দর! ভাবা যায় এগুলো? আমাদের চিন্তা ভাবনা কতটা বিকৃতি হয়ে গিয়েছে। সম্ভব হলে আমি ভিডিওটি যুক্ত করে দিবো, আপনারা একটু কষ্ট করে দেখে নিবেন।

বর্তমান যুবসমাজের এই চিন্তাকে আপনি কি বলবেন – সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়? নাকি সবকিছুই করছে ভাইরাল হওয়ার নেশায়? ইন্টারনেটে এমন অনেক ইন্টারভিউ ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় বাবার বয়সী পুরুষ কিংবা মায়ের বয়সী নারীকে বিয়ের খবর অহরহর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা নাকি ভালোবাসা?

তিশা এবং মুশতাক তাদের স্বাধীনতা অনুযায়ী সবকিছু করতে পারে। তবে এই ধরনের মূল্যহীন বই পাবলিশ করে যুব সমাজের চিন্তা-ভাবনা বিকৃতি করার কোন মানে হয় না। এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ বই পড়ে পাঠকদের বইয়ের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হবে।

বৈধ সম্পর্ক নিয়ে আমার কোন মতামত নেই, তবে এগুলোকে প্রমোট করে অল্প বয়সী তরুণ তরুণীদের মাথা বিকৃতি করার কোন ফায়দা নেই। নাকি এটিও কিয়ামতের শেষ আলামত? লজ্জা ও নৈতিকতা আল্লাহ কর্তৃক তুলে নেওয়া হয়েছে।

আপনি একটু খোঁজাখুঁজি করলে দেখতে পারবেন বয়সের বেশি পার্থক্য থাকা সম্পর্কগুলো টিকে থাকে ২% এর মত। ১৫ থেকে ২২ বছরের তরুণীরা বেশিরভাগ বয়স্ক লোককে বিবাহ করতে আগ্রহ পোষণ করে। হয়তো এই বয়সে তরুণীরা ভাবে “টাকা থাকা মানেই সব”

টাকা আছে তো সুখ আছে। আসলে এই বিষয়টা কিন্তু মোটেও এমন নয়। একটা সময় পড়ে বয়সের বেশি পার্থক্য থাকায় তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মতামত ও চিন্তাধারা আলাদা হয়। যার ফলে অশান্তি এমনকি হাতাহাতি থেকে ডিভোর্স পর্যন্ত হতে দেখেছি।

একটা সম্পর্ক টিকে থাকায় টাকার পাশাপাশি নিজেদের বন্ডিং থাকাটা অবশ্যক। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি উদাহরণ অনেক বেশি ঘুরে বেড়ায় “বিল গেটসের ডিভোর্স” একসময়ের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনীর সংসারে ডিভোর্সের মত ভয়ানক ঘটনা ঘটে।

তাই অনুরোধ করবো, এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে অবশ্যই ভালোভাবে ভাবা উচিত। ইন্টারনেটে যতগুলো সুগার ডেডি বা সুগার মাম্মি টাইপের ইন্টারভিউ দেখলাম, সবাই আবেগে এবং টাকার লোভে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

অনেকে তো সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এগুলোকে আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় বলাই যায়। এবং কিছু কিছু টিভি নাটক ও এই টাইপের কু রুচি সম্পন্ন বইগুলো উঠতি বয়স্ক তরুণ তরুণীদের মস্তিষ্ক বিকৃত করে দিচ্ছে। যার সম্পূর্ণ দায়ভার তাদের।

দয়া করে যে কোন বই প্রকাশ করার আগে “এই বই দ্বারা মানুষের মস্তিষ্কে কি ধরনের প্রভাব ফেলবে” তা ভাবা উচিত। এমন কোন বই প্রকাশ করা উচিত না যা সমাজে এবং মানুষের মস্তিষ্কে খারাপ প্রভাব ফেলে।

তাই প্রকাশনীগুলোকে অনুরোধ করবো, যেকোনো ধরনের বই প্রকাশ করার পূর্বে অবশ্যই পাঠকদের কথা মাথায় রেখে এবং বইয়ের দ্বারা সমাজে কি ধরনের প্রভাব ফেলবে তা চিন্তা করার জন্য। সঠিক তথ্য বা সঠিক চিন্তা প্রদানের মাধ্যমে একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি বদলানো যায়।

অনেকেই মন্তব্য করছে, এই ধরনের বইগুলো নাকি বিনোদন। হতে পারে এটা বিনোদন, তবে অসুস্থ বিনোদন। আপনাদের যদি বিনোদন নেওয়ার প্রয়োজন হয় তাহলে অনেক কৌতুকের বই পাবেন। যেগুলো পড়ে আপনার অবসর সময়ে বিনোদনের মধ্যে কাটাতে পারেন।

আজকে সকালে ফেসবুকের নিউজফিড ঘাটতে হঠাৎ সামনে পড়লো Erfan Sadik ভাইয়ের একটি পোস্ট। সেখানে দেখলাম একজন লোক পিঠে ব্যানার ঝুলিয়ে বই বিক্রি করছে। ব্যানারে লেখা ছিল “২১শে ফেব্রুয়ারি প্রসঙ্গে অমল রায়ের ২টি নাটক মাত্র ৫ টাকায়” হয়তোবা তার বইটির দাম মাত্র ৫ টাকা।

“মান্না দে” এর “কফি হাউজের সেই আড্ডাটা” গানের অমলের সাথে খুব মিল পেলাম। এবং গানের একটি কলি Erfan Sadik ভাইয়ের পোস্টে উল্লেখ করা ছিল। আমি নিচে একটি স্ক্রিনশট দিয়ে দিবো। যাইহোক এই বিষয় নিয়ে আমার কোন মতামত নেই।

মুশতাক এবং তিশার বিষয় নিয়ে আপনাদের সামনে আমার মতামত তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। মুশতাক এবং তিশার প্রকাশ করা বইগুলো সম্পর্কে আপনার মতামত কি? চাইলে আমাকে জানাতে পারেন।

– শিহাব কাজী, পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ।

প্রথম প্রকাশ ছিল ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখ।

আমার লেখা অন্যান্য ব্লগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *