ডোপামিনের দাসত্বে আপনার আমার জীবন ধ্বংস
বর্তমান সময়ের সবথেকে দামি কারেন্সি কি?
আপনি যদি আমাকে এই প্রশ্ন করেন আমি উত্তর দিব: বর্তমান সময়ের সবথেকে দামি কারেন্সি হলো এটেনশন (Attention)।
ব্যবসা-বাণিজ্যে, মুভি ইন্ডাস্ট্রি, পর্ন ইন্ডাস্ট্রি ও এডভার্টাইজমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি সবকিছু চলতেছে ছেলেদেরকে হুক করার মাধ্যমে। পুরুষ জাতির এটেনশন বা মনোযোগ ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন মেয়েদের নানান ভাবে উপস্থাপন চলছে ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে।
মনোযোগ = প্রভাব = অর্থ । এই সূত্র ধরে ইন্ডাস্ট্রিগুলো পুরুষ জাতিকে হুক করে তাদের নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিল করছে।
তারা বিভিন্নভাবে এটেনশন (Attention) গ্রাপ করে। তারপরে তাদের প্রচারণা কিংবা স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম হাসিল করে। যার উদ্দেশ্য থাকে অর্থ উপার্জন বা টাকা-পয়সা উপার্জন করা।
আমরা নিজেদের অজান্তেই ডোপামিনের ফাঁদে পড়ে এই সকল ব্যবসায়িক ফ্যানেলে ঢুকে যাচ্ছি। যা আমাদের মনোযোগ নষ্ট ও সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কোন উপকারে আসছে না।
তাই বলা হয় বর্তমান সময়ের সব থেকে দামি কারেন্সি হল এটেনশন (Attention)। যা আপনি সঠিক জায়গায় ব্যবহার করতে পারলে নিজের উন্নতি করা সম্ভব। আর যদি আপনার মনোযোগ বা এটেনশন অন্য কেউ প্রভাবিত করে, তাহলে আপনাকে ব্যবহার করে সে উন্নতি করবে।
YouTube, Facebook, TikTok, Instagram সব প্ল্যাটফর্মেই অ্যালগরিদম কাজ করে মানুষের Attention ধরে রাখার ভিত্তিতে। আপনি লক্ষ্য করবেন আপনাকে একটার পরে আরেকটা ইন্টারেস্টিং ভিডিও কিংবা ছবি শো করবে নিউজ ফিডে। যাতে আপনি নিউজফিড থেকে সরে না যান।
নিউজ + ফিড – সোশ্যাল মিডিয়া গুলোর এই নিউজফিড নামকরণের একটি কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। আমরা যখন Scroll করি আমাদের সামনে বিভিন্ন ধরনের তথ্য শো করে। এর মধ্যে খারাপ তথ্য বা আকর্ষণীয় তথ্য থাকবে ৮০%। যা আমাদের ফিড করে খাওয়ানো হয়।
আমাদের ব্রেইন এর মধ্যে এই সকল তথ্যগুলোকে ফিড করে পুশ করা হয়। যা আমাদের ডোপামিন রিলিজ করে এবং আমরা স্বস্তি বা হ্যাপি অনুভব করি। ধীরে ধীরে আমরা এতে আসক্ত হয়ে যায় এবং আমাদের মূল্যবান সময় ও এটেনশন অপচয় করি।
এটেনশন নিয়ে এই কারা-কারির যুগে ব্রান্ডগুলো বিভিন্নভাবে আমাদের মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ব্রান্ডগুলো শুধু পণ্য বিক্রি করছে না পাশাপাশি আমাদের এটেনশন কিনছে। এজন্য বিজ্ঞাপন, ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং, কোলাবোরেশন সবই হচ্ছে Attention Economy-র অংশ।
Microsoft Attention Span Research (2015)-এ দেখা গিয়েছে ২০০০ সালে মানুষের গড় মনোযোগের সময় ছিল ১২ সেকেন্ড। ২০১৫ সালে নেমে আসে মাত্র ৮ সেকেন্ডে। ২০২৫ সালে এর অবস্থা অনেক বেশি ভয়াবহ।
বর্তমানে আমরা একটি গোল্ডফিশের থেকেও কম সময় নিজেদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারি। চারদিকে এত ব্রান্ডের বিজ্ঞাপন এত এত নেগেটিভ জিনিস আমাদের মস্তিষ্ককে বিকৃতি করে মনোযোগ নিয়ে যাচ্ছে।
Harvard Business Review (HBR) – The Attention Economy (2017) এর একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে “মনোযোগ একটি দুষ্প্রাপ্য সম্পদ” প্রতিষ্ঠানগুলো ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং, এমনকি লিডারশিপ ট্রেনিংয়েও “Attention Management” কে নতুন স্কিল হিসেবে নিচ্ছে।
Meta Internal Research টিম বলেছে, ফেসবুক তাদের অ্যালগরিদম ডিজাইন করেছে যাতে ব্যবহারকারীর মনোযোগ যত বেশি সময় ধরে রাখা যায়। “Time on Platform” টার্ম অনুযায়ী ব্যবহারকারীরা যত বেশি ফেসবুক ফিডে থাকবে তত বেশি বিজ্ঞাপন বিক্রি হবে।
ছোটখাটো একটা উদাহরণ থেকে বুঝে নেই
সম্প্রতি বাংলাদেশে পাকিস্তানের একজন নায়িকা হানিয়া আমির সানস্লিকের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে বাংলাদেশে আসার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের বেশিরভাগ তরুণ তাকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা শুরু করে।
সম্ভবত ১৫ সেপ্টেম্বর ফেসবুক ফিডে প্রবেশের সাথে সাথে দেখি হানিয়া আমিরের ছবি এবং ভিডিও। একে নিয়ে এত পরিমানে মাতামাতি করা হচ্ছে যেটা আসলেই একটা অসুস্থ জেনারেশন এর প্রতিচ্ছবি।
এইখানে হানিয়া আমির বাংলাদেশে আসবে, তাকে নিয়ে সানস্লিক ব্রান্ড তাদের মার্কেটিং করছে তাদের পরিচিতি বাড়াচ্ছে। ব্রান্ড এবং ইনফ্লুয়েন্সার উভয়ের স্বার্থ হাসিলের পদ্ধতি দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমার আপনার স্বার্থ কই?
হানিয়া আমিরের স্বার্থঃ হানিয়া আমির বাংলাদেশে আসার মাধ্যমে তার নতুন একটি দেশ এক্সপ্লোর করা হলো, সানসিল্ক ব্রান্ডের থেকে মোটা অংকের টাকা পাবে, এবং বাংলাদেশের অন্যান্য ব্রান্ডের সাথে তার যোগাযোগ স্মুথ হবে, পাশাপাশি বাংলাদেশে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে।
সানস্লিক ব্রান্ডের স্বার্থঃ ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে হানিয়া আমির বাংলাদেশে আশায় সানস্লিক ব্রান্ড তাদের মার্কেটিং স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে। সুকৌশলে আমাদের এটেনশন গুলো কেড়ে নিয়ে আমাদের মস্তিষ্কে তাদের ব্রান্ডের চিহ্ন রেখে যাচ্ছে। এছাড়া আরো অনেক ব্যবসায়িক স্বার্থ আছে।
আমাদের স্বার্থঃ প্লাস্টিক সার্জারি করা, আটা ময়দা মাখানো, ১০০/১০০ ফিল্টার ইউজ করা হানিয়া আমিরের কিছু বাঁকানো চিতানো ছবি, কিছু ভিডিও দেখলাম শুধু। এগুলো দেখবো এবং তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় গিয়ে কমেন্ট করব “you are so beautiful, crash, welcome to our country Crush, ETC”।
এইগুলোরে দেখে ক্রাশ খেয়ে আমাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করতেছি। অপরদিকে এই সকল সেলিব্রেটিরা আমাদের এটেনশন বা সময় নিয়ে ব্রান্ডগুলোর কাছে ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের পরিচিতি ও ডিমান্ড বাড়িয়ে নিচ্ছে।
আমাদের সময় নিয়ে এরা iphone কিনে, বিদেশ টুর দেয়, পৃথিবীর সুন্দর সুন্দরতম স্থানগুলো ঘুরে। ওইখানে গিয়ে আবার ছবি ও ভিডিও করে পুনরায় আমাদের এটেনশন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এভাবেই ঘুরছে এক ভয়ংকর গাড়ির চাকা।
এই লেখাটি দেখার পরে ভাবলেন আপনি আপনার সময় ও এটেনশন ঠিকঠাকভাবে ম্যানেজ করবেন। নিজের মতো করে সুন্দর একটি রুটিন তৈরি করলেন এবং সেটিকে আপনার টেবিলের সামনে টানিয়ে রাখলেন। কিন্তু হঠাৎ করে ফেসবুক অথবা ইনস্টাগ্রাম থেকে একটি নোটিফিকেশন আসলো।
যেইখানে আপনার পছন্দের কোন সেলিব্রেটি তার দেহ অর্ধ-উলঙ্গ করে ছবি দিয়েছে। ব্যাস শেষ! আপনার ওই রুটিন আপনার মোটিভেশন সবকিছু এখানেই সমাপ্ত। এরপরে আপনি কমেন্ট করতে লেগে যাবেন, লেগে যাবেন সোশ্যাল মিডিয়া নিউজফিড Scroll করতে।
তবে এর থেকেও ভয়ংকর বিষয় হলো এই মডেল গুলো যদি ১৮+ কোন ছবি আপলোড করে তাহলে আপনার Scrolling এর সমাপ্ত হতে পারে google chrome incognito mode-এ।
Ahrefs এর তথ্য অনুযায়ী গত দুই দিনে শুধুমাত্র গুগলে 18+ ৩ ওয়ার্ডের একটি কিওয়ার্ড লিখে সার্চ হয়েছে ১ মিলিয়ন বারের বেশি। অন্যান্য সকল কিওয়ার্ড বা ওয়ার্ডের কথা তো বাদই দিলাম। তাহলে চিন্তা করেন বর্তমান পরিস্থিতি।
বাংলাদেশের অধিকাংশ পুরুষ (বিবাহিত + অবিবাহিত) প্রতিদিন এই লুপের মধ্যে চক্কর খাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিল করার জন্য মেয়েদেরকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে ছেলেদের হুক করে। আপনাকে একটা অবাক করা তথ্য বলি।
৩ হাজার বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে মেয়েদের দেহ। আর এই মেয়েদের দেহ ব্যবহার করে বিভিন্নভাবে ছেলেদেরকে হুক করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো। এই সুপরিকল্পিত ফ্যানেলে প্রতিনিয়ত ঘুরে ফিরে নিজেদের সময়, মনোযোগ ও ব্যক্তিত্ব নষ্ট করছি আমরা।
এর থেকে হঠাৎ করে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়, তবে মুক্তি পাওয়া একেবারে অসম্ভব ও নয়। প্রথমে যাবতীয় সোশ্যাল মিডিয়াগুলো থেকে এই ধরনের ইনসুলেন্সারদের আনফলো করে দিতে হবে। যাদের দিয়ে আপনার কোন উপকার হচ্ছে না বা যাদের কোন কর্মকান্ডে আপনার উপকার হচ্ছে না তাদেরকে ফলো করা বাদ দিন।
এদেরকে বাদ দিয়ে যাদের কনটেন্ট বা লেখার মাধ্যমে আপনার উপকার হবে তাদেরকে ফলো করা শুরু করুন। এবং নিজের মন ও চিন্তা ভাবনাকে কন্ট্রোল করতে বিভিন্ন ধরনের মোটিভেশনাল ভিডিও বা লেখা ব্লগ দেখতে পারেন। পাশাপাশি উপর ওয়ালার কাছে প্রার্থনা করুন এবং ধর্মীয় শাসন মেলে চলুন।
“Don’t waste your time chasing butterflies. Mend your garden, and the butterflies will come.” ― Mário Quintana
ডোপামিনের দাসত্ব থেকে মুক্ত হলে জীবন সুন্দর। বর্তমান সময়ের সব থেকে দামি কারেন্সি আমাদের মনোযোগ সঠিক জায়গায় ব্যবহার করতে হবে। অযথা তথ্য, বিনোদন থেকে নিজেদের সরিয়ে প্রোডাক্টিভ কাজের মধ্যে যুক্ত করতে হবে।
Herbert A. Simon (Nobel Laureate Economist, 1971) বলেন “A wealth of information creates a poverty of attention.” অর্থাৎ যত বেশি তথ্য আসছে, মানুষের মনোযোগ তত কমে যাচ্ছে। পরবর্তীতে এই ধারণা থেকেই শুরু হয় Attention Economy টার্মটির ব্যবহার।
শেষকথা
ধৈর্য নিয়ে এতক্ষণ লেখাটি দেখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনি যেহেতু ধৈর্য নিয়ে এত সময়ে এত কঠিন লেখাটি মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন আমি আশা করছি আপনি একটু চেষ্টা করলে ডোপামিনের দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারবেন।
আমি আপনাকে অনুরোধ করব আমাকে যদি কখনো ডোপামিনের দাসত্ব করতে দেখেন আপনি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করবেন এবং আমাকে ওখান থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। এভাবে করে আমরা একজন আরেকজনকে সহযোগিতা করতে পারি।
আপনার হাতে সময় থাকলে কন্টেন্ট মনিটাইজেশন বর্তমান সমাজের নতুন মহামারী ভাইরাস আমার এই লেখাটি দেখতে পারেন। বর্তমান সময়ের সোশ্যাল মিডিয়াগুলো কিভাবে আমাদের মানসিকতা বিকৃতি করছে এ সম্পর্কে জানতে পারবেন।
শিহাব কাজী, পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ।
প্রথম প্রকাশ ছিল ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখ।

